সাহারা খাতুনঃ জীবন-মৃত্যু নিয়েও তামাশা!

আপডেট: জুন ২১, ২০২০
0

সোহেল সানি :
প্রাণঘাতী করোনাও বাঙালি জাতির মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করতে পারছে না।
স্বাধীনতার মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আর মানবিকতা সে-তো কথার কথা।
আমরা বেঁচে আছি এটা অস্বাভাবিক, মরে যাবো সেটাই স্বাভাবিক। সেই অর্থে তো “জন্মের প্রকৃতবন্ধু মৃত্যু।” তবুও কেনো মানুষের এতো আত্মগরিমা, হিংসা, বিগ্রহ, বিদ্বেষ, পাষাণভেদী চিন্তা?
রাতে সামাজিক গণমাধ্যমের একটি খবরে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ভীষণভাবে হোঁচট খেয়েছে। খবরটি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর খবর। যা কল্পিত নাকি নিছক একটি গুজব?
তা ভাববার অবকাশ কৈ? তাই মন ছেয়ে যায় বিষাদ বেদনায়। অতীতের তিক্তঅভিজ্ঞতা আছে। তাই মৃত্যুর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ভাবতে থাকি কাকে ফোন করি। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মোজাফফর হোসেন পল্টুকেই বেছে নেই। তাঁকে মুঠোফোনে পাওয়ার চেষ্টা করলাম। রাত দেড়টা বলে কথা। রিং বাজলেও রিসিভ হলো না ও প্রান্ত থেকে।
তাঁকে ফের কল করাটা কান্ডজ্ঞানহীন কাজ। তাই ক্ষান্ত থাকলাম। তারপর মাথায় ঢুকলো, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর কথা। তাঁকে কল করলাম। কিন্তু রিসিভ হলো না।
রাজনীতির একসময়কার কিং মেকার ও সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এককালীন দিকপাল মোজাফফর হোসেন পল্টু, দুজনেরই অত্যন্ত কাছের মানুষ সাহারা খাতুন। মোজাফফর হোসেন পল্টু যখন অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তখন সাহারা খাতুন অন্যতম সহ সভাপতি।
আওয়ামী লীগের দুর্দিনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত গ্রুপ বলতে আমির হোসেন আমু, প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ নাসিম, মোজাফফর হোসেন পল্টুকেই বোঝাতো। আর এই গ্রুপেরই সাহারা খাতুন।
যাহোক, এসব যখন ভাবছিলাম, ঠিক তখনই মোজাফফর হোসেন পল্টুর কল। কি রে, বলতেই
তাঁকে জানালাম,ফেইসবুকে সাহারা খাতুনের মৃত্যুর খবরের বিষয়টি।
তিনি মূহুর্তে নির্জীব হয়ে গেলেন। কতক্ষণ পর বললেন,বলছিস কি? বললাম নিশ্চিত হতে পারছি না লিডার। তিনি বললেন, রাখ-তো আমি দেখছি, খবরটা যাচাই করে। কেটে গেলো পাঁচসাত মিনিট। এলো মোজাফফর হোসেন পল্টুর কল। বললেন, সাহারা খাতুনের ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। এটা গুজব, অপপ্রচার। সাহারা বেঁচে আছে।
ততক্ষণে মোজাফফর হোসেন পল্টুর ভারাক্রান্ত কন্ঠটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আসলে দীর্ঘদিনের সহকর্মীর সান্নিধ্য-তো, ছিন্ন হয় কি করে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোজাফফর হোসেন পল্টু বললেন, আসলে মানুষ মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছে। আমরা কোথায় পৌঁছে গেছি। মৃত্যু নিয়েও তামাশা! প্রয়াত নাসিম এবং জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আওয়ামী লীগ নেত্রী সাহারার সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্যতার কথা তুলে ধরে একটুআধটু স্মৃতিচারণ করলেন তিনি।
এভাবেই ঘড়ির কাটা রাত আড়াই টার ঘরে পৌঁছে যায়। মনে প্রশ্ন জাগে, সামাজিক গণমাধ্যম আমাদের জাতিগঠন ও বিকাশে কতটা ইতিবাচক ভুমিকা রাখছে? আমরা মাঝেমধ্যে এমন সব স্ট্যাটাস প্রত্যক্ষ করি, যা মধ্যযুগীয় মানসিকতাকে ছাপিয়ে যায়। জীবিত ব্যক্তিকে মৃত্যু ঘোষণা, এ-ও কি সম্ভব? শুধু তাই নয়, মৃত্যু ব্যক্তির লাশ কবরস্থ করার পরপরই নানা বিষোদগার! কুরুচিপূর্ণ কত-না মন্তব্য। এসব আমরা হরহামেশাই দেখতে পাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এখন জিঘাংসায় রূপ নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, এ খবর কারো অজানা নয়।
তিনি এ দেশের প্রথম মহিলা, যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেন।
একাকীত্বের জীবন বেছে নেয়া এ মহীয়সী নারী বিরল। সত্যিকার অর্থেই দেশমাতৃকার জন্য জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন সাহারা খাতুন। রাজপথেরও অকুতোভয়া নারী সংগঠক তিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্যানেল আইনজীবীদের মধ্যে অন্যতম সাহারা খাতুন। “৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ঐক্যমতের সরকার গঠন করলে সাহারা সহকারী এটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। তখন তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ আইন সম্পাদক।
নির্যাতন, নিপীড়নের মুখেও তিনি পরীক্ষিত, এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সন্তান। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার এক নিবেদিত প্রাণ। রাজনীতির মাঠ পর্যায় থেকে উঠে আসা সাহারা খাতুন বয়সেও আশি ছুঁইছুঁই।
তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে রয়েছেন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে।
জন্মমৃত্যু আল্লাহর হাতে। মৃত্যু সবার জন্যই অনিবার্য। জন্মের স্বাদ যখন নিয়েছি, মৃত্যুর যন্ত্রণা পোহাতেই হবে এবং তা মানুষ মাত্রেই। কিন্তু সামাজিক গণমাধ্যমে লক্ষ্য করছি, আমাদের দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ যখনই জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপবিষ্ট, তখনই একশ্রেণির কুচক্রীমহল নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে যায়। তারা জীবিত ব্যক্তিকে মৃত্যু ঘোষণা করে কি ফায়দা লোটেন তা, জানিনা। তবে এ নিষ্ঠুরতম কাজটি তারা করেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, স্রেফ রাজনৈতিক জিঘাংসা থেকেই এ বিকৃত মানসিকতার উদ্ভব। প্রয়াত আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর আগেপিছে সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে কতিপয় ব্যক্তির কটুক্তি, সর্বোপরি কুরুচিপূর্ণ আচরণ পশুতুল্য। তদ্রুপ আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর খবর প্রচার করা কতটা নির্দয় ও নিষ্ঠুর, তা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি? তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন তাই বলে তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে কি প্রশান্তি লাভ করতে পারি? মানবিক মূল্যবোধের কতটা অবক্ষয় ঘটেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ তামাশা ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, গোটা জাতিকে নিয়ে। কেননা এই ব্যক্তিগুলোই সমষ্টির স্বপ্নকে ধারণ করে।
রাজনীতিকে বাঁচাতে হলে রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
মনে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে –
মৃত্যু হলেও তাঁরা মৃত নন, মৃত্যুঞ্জয়ী। তাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।

লেখক,সিনিয়র সাংবাদিক,সম্পাদক দেশ জনতা ডটকম

LEAVE A REPLY