` ‌ভূমিদস্যুদের কবল থেকে তিন ফসলী জমি রক্ষা করুন’

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২০
0

তৈমূর আলম খন্দকার

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

“তিন ফসলী জমি ভরাট করা যাবে না, খাল, বিল, নদী-নালা ভরাট করা যাবে না, পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না, অপরিকল্পীত ভাবে কোন শিল্প কলকারখানা বা আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। জমি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।” কিন্তু ভূমিদস্যুরা এতোই প্রভাবশালী যে, আপনার নির্দেশের কোন প্রকার তোয়াক্কা না করেই রাজধানীর আশে পাশে বিশেষ করে রূপগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের নামে তিন ফসলী জমি, খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা ভরাট করে ফেলছে। রূপগঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশী জমি বালু দিয়ে ভরাট করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ।

বসুন্ধরা গ্রুপ রূপগঞ্জে তিন ফসলী জমি ভরাট করে আবাসন করার জন্য সরকার বা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোন প্রকার অনুমতি গ্রহণ করে নাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রূপগঞ্জে এখন আর ধান, সবজি ও মাছের চাষ হচ্ছে না, এখন শুধু হচ্ছে বালির চাষ। বসুন্ধরা গ্রুপ নিজেই অনেকগুলি পত্রিকার মালিক।

কেহ এই বালু ভরাটের প্রতিবাদ করলে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকাগুলিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চরিত্র হরন করে সিরিজ আকারে মিথ্যা বানোয়াট রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকে। এ কারণে অবৈধ বালু ভরাটের বিরুদ্ধে মানুষ ভয়ে কথা বলতে চায় না। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বালু ভরাটের কার্যক্রম শুরু করার জন্য ৭০টি ড্রেজার বসানো হয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই বালু ভরাটের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার বলিষ্ট হস্তক্ষেপ ছাড়া তিন ফসলী জমি, খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা ভরাট বন্ধ হবে না।

ভূমিদস্যুরা এতোই শক্তিশালী যে, তাহারা হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞাও মান্য করছে না। অবৈধ বালু ভারাটের বিষয়ে মহামান্য হাই কোর্টে কয়েকটি রিট পিটিশনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করলেও তা কার্যকর হয় নাই। রূপগঞ্জের সাধারণ কৃষকগণ এখন অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নিজের কৃষি জমি বালু দ্বারা ভরাট হয়ে যাচ্ছে, একমাত্র মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের নিকট স্বারক লিপি দেয়া ছাড়া অসহায় কৃষকরা অন্য কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট কেহ বা জেলা প্রশাসক এ বালু ভরাটের বিরুদ্ধে কৃষকদের পাশে দাড়াচ্ছে না। অসহায় কৃষকরা এখন আপনার মূখের দিকে তাকিয়ে আছে।

রাজধানীকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য রাজধানীর চতুর পার্শ্বে একটি সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্য সরকার ইতোপূর্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করে ছিল। ধান শাকসবজি উৎপাদনের জন্য রূপগঞ্জ একটি পলিমাটি উর্বর এলাকা। দুইটি নদী যথা শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী বেষ্ঠিত হওয়ায় রূপগঞ্জের মাটি অনেক উর্বর বিধায় তিন ফসলী চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে রূপগঞ্জকে এখন শ্বশানে পরিনত করা হচ্ছে যা থেকে একমাত্র আপনি রূপগঞ্জ বাসীকে উর্দ্ধার করতে পারেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি যদি সদয় হয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত টিম রূপগঞ্জে পাঠান তবেই এর সত্যতা খুজে পাবেন। ভূমিদস্যুরা তাদের মালিকানাধীন মিডিয়াকে একটি অপশক্তি হিসাবে ব্যবহার করছে, এ বিষয়গুলিও আপনার দৃষ্টিতে থাকা একান্ত বাঞ্চনীয়।

তিন ফসলী জমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত ভাবে যে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে কিন্তু দেশের আপামর জনগণ লাভবান হচ্ছে না। কারণ রাজধানীতে অনেক বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে যেখানে পানি ও গ্যাস সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। রাজধানী এবং আশে পাশে ভাড়া বিহীন এখনো অনেক ফ্লাট পড়ে আছে, এমতাবস্থায় আবাসন প্রকল্পের নামে তিন ফসলী জমি ধ্বংস করা একটি বাতুলতা মাত্র। রূপগঞ্জে সরকারী উদ্দ্যেগে একটি পূর্বাচল শহর গড়ে উঠেছে, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত ইমারত গড়ে উঠে নাই। রাজউক কর্তৃক উত্তরায় অনেক প্লট বরাদ্দ হলেও সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠে নাই এবং আসামী ২০ বৎসরে উত্তরাতে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠবে কি না তাতে অনেক সন্দেহ বিদ্যমান রয়েছে। সেখানে অনেকে সবজি চাষ করছে, বাকী প্লটগুলি কাশবনে পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় উল্লেখিত আবাসন প্রকল্প যেখানে চাহিদা পূরন করার পরও খালি পড়ে আছে সেখানে তিনফসলী জমিগুলি ধ্বংস করে রূপগঞ্জে এতো আবাসন প্রকল্প স্থাপন করায় যৌক্তিকতা কোথায়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ৫০ বৎসর পুর্তি উপলক্ষে সূবর্ন জয়ন্তী পালন করার জন্য দল মত নির্বিশেষে জাতি ও আপনি উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ইতোপূর্বে পাকিস্তানের ২২ পরিবার যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতো, সে স্থলে ২২ হাজার শোষনকারী গোষ্টি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ এখন পর্যন্ত স্বাধীনতার সূফল ভোগ করতে পারছে না। বাংলাদেশে লাভের গুড় এখন পিপড়ায় খায়। শোষণকারীদের বিরুদ্ধে নালিশ করার কোথাও কোন জায়গা নাই। কারণ দৃশ্যত: মনে হচ্ছে যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যেন কারো কারো পকেটস্থ হয়ে পড়েছে, তাদের মূখের কথাই যেন আইন এবং তাদের সেবা দাসে পরিনত হওয়াটাই যেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একমাত্র কামনা ও বাসনা।

রাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যমত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া হলেও একটি অপরটির সম্পূরক। কৃষকদের স্বার্থে রক্ষা জাতীয় ঐক্যের সাথে সম্পৃক্ত। “কৃষক বাচলে দেশ বাচবে” এটা নতুন কোন শ্লোগান নহে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা বসেছেন তারা সকলেই এ শ্লোগানের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে কৃষকরাই সবচেয়ে অবহেলিত। জমি কৃষকের, অথচ আবাসন প্রকল্প করার জন্য ভরাট করে ফেলে অন্য জনে, একটা দেশে এটা কেমন আইন? কৃষক থেকে ন্যায্য মূল্যে জমি কিনবে না, তাকে ন্যায্য মূল্য দিবে না, অথচ ভরাট করে ফেলছে, প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীর বিরুদ্ধে লাঞ্চনা বঞ্চনার শেষ নাই, হয় তাকে পুলিশ দ্বারা হয়রানী করবে, নতুবা গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিবে, অথবা তাদের নিজস্ব মিডিয়ার মিথ্যার মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মান ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করবে, টানাটানি করবে প্রতিবাদকারীর ব্যক্তি জীবন নিয়ে। কোথাও গুম করার হুমকি, কোথাও দিচ্ছে খুন করার হুমকি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিশ্চয় জানেন যে, সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারন, হস্তান্তর ও অন্যভাবে বিলি ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কতৃত্ব ব্যতীত কোন সম্পত্তি বাধ্যতামূলক ভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ব বা দখল করা যাইবে না।”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই যে, আপনি সংবিধানকে সম্মুন্নতি রাখার জন্য শপথ বাক্য পাঠ করেছেন। অথচ সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদ লংঘন করে রূপগঞ্জে সাধারণ নিরীহ জনগণের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে এ মর্মে কি আপনার কোন কিছু করনীয় নাই? নাকি আপনার জ্ঞাতসারেই ভূমিদস্যুদের নিকট দেশ ও জাতির জিম্মি হয়ে পড়েছে? এ জিম্মিদসা থেকে কৃষকদের তিন ফসলী জমি উর্দ্ধার করার জন্য আপনি কোন প্রকারে উদ্দ্যেগ গ্রহণ করার কি প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না?

জমির ঈযধৎধপঃবৎ পরিবর্তন করতে হলে আইনত জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে। ইটার ভাটা করার জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগবে। কিন্তু তিন ফসলী জমি ভরাট করে জমির ঈযধৎধপঃবৎ পরিবর্তন করা হচ্ছে, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই আবাসিক এলাকায় ইটার ভাটা গড়ে উঠছে। অথচ জেলা প্রশাসক এ মর্মে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে (!) এটা কিসের আলামত?

দেশে অনেক বুদ্দিজীবি সমাজ রয়েছে। যারা টক-শোতে অনেক কথা বলেন, অনেক সাংবাদিক রয়েছে যারা নিজেদের জাতির বিবেক হিসাবে দাবী করেন। কিন্তু তারা কেহই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে দুটি কথা বলেন না, কলমও ধরেন না এটা কিসের আলামত?

দেশে যখন অবিচার, অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন মানুষ সাংবাদিকদের নিকট আশ্রয় খোজে। ভুক্তভোগী এলাকায় রূপগঞ্জে দুইটি প্রেস ক্লাব রয়েছে বলে জেনেছি। অথচ ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জের সাংবাদিকদের “কলম” উঠে না এটা কিসের আলামত? অথচ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি জাতির বিবেক কি এমনিভাবে হারিয়ে যাবে? মহান মুক্তিযুদ্ধ করার এই জাতি কি কারো কারো পকেটস্থ হয়ে যাবে? “জোর যার মুল্লুক তার” এ নীতিতেই যদি দেশ ও জাতি চলতে থাকে তবে আইন আদালত, প্রশাসন, সংবিধানের কি প্রয়োজনীতা রয়েছে? এ ছাড়াও এ ধরনের পরিস্থিতি দেখার জন্যই কি জাতি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ছিল? সবলের পক্ষে এবং দূর্বলের বিপক্ষে দাড়ানোই কি “বিবেকমান”দের সংস্কৃতি হয়ে দাড়িয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন যে, বুদ্দিজীবিরা এখন চামচাগীরিতে ব্যস্ত। অন্যতম শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন যে, এ জাতি তাদের বিবেক হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের বিবেক ভোতা হয়েগেছে। সকলেই এখন অর্থের পিছনে দৌড়ায়। যেখানে অর্থ পাওয়া যায় সেখানে কারো সম্মানহানী করার জন্য লেখকের অভাব হয় না। অথচ দূর্বলের পক্ষে কলম ধরার লেখক হারিয়ে যাচ্ছে কেন? এটা কিসের আলামত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

লেখক

রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)