সেই হারের স্মৃতি এখনো ভোলেননি ওয়াসিম আকরাম

আপডেট: মে ২০, ২০২০
0
ছবি সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট:
১৯৯৯ সালে প্রথমবারেরমত ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই বড় ধরনের চমক দেখিয়েছিলো বাংলাদেশ। শক্তিশালী পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারের লজ্জা দিয়েছিলো বিশ্বকাপের নতুন দল বাংলাদেশ। সেই হারের স্মৃতি এখনো ভোলেননি ওই ম্যাচে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেয়া ওয়াসিম আকরাম।

গতকাল রাতে বাংলাদেশের বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালে ধারাবাহিক লাইভ শো’তে উপস্থিত ছিলেন ওয়াসিম। ১ ঘন্টা ১৭ মিনিটের সেই আড্ডায় ওয়াসিমের সাথে উপস্থিতি ছিলেন ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেয়া আকরাম খান, ব্যাটিং অলরাউন্ডার মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ও উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ পাইলট। চারজনকে নিয়ে অনেক স্মৃতি রোমন্থন করেন তামিম।

১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ উঠতেই ওয়াসিম বলেন, ‘ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, আমি বলব সেদিন বাংলাদেশ আমাদের চাইতে অনেক ভালো ক্রিকেট খেলেছিল। আমাদের চেয়ে সেদিন বাংলাদেশই ভালো ক্রিকেট খেলেছিল। টুর্নামেন্টে বেশির ভাগ ম্যাচে আমরা প্রথমে ব্যাট করেছি। ওই ম্যাচে আমরা রান তাড়ার অনুশীলন করতে চেয়েছিলাম। আমরা ব্যাটিং ভালো করতে পারিনি। কারন বাংলাদেশ ভালো বল করেছিল। মিডিয়াম পেস বলে সুইং ভালো হচ্ছিল, ডিউ ফ্যাক্টরও ছিল। এটা আমাদের পাকিস্তানিদের জন্য হতাশার হলেও, বাংলাদেশের জন্য দারুন অর্জন ছিলো। এজন্য আমি তাদের প্রশংসাও করেছিলাম। ম্যাচ শেষে তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম আমি।’

১৯৯৯ সালের ৩১ মে নর্দাম্পটনে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। টস জিতে ফিল্ডিং করতে নামে পাকিস্তান। প্রথমে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ২২৩ রান করে বাংলাদেশ। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪২ রান করেন আকরাম খান। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪০ রান আসে মি. এক্সট্রার কাছ থেকে। এছাড়া ৩৯ রান করেন ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ।

জয়ের জন্য ২২৪ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে খেই হারিয়ে ফেলে পাকিস্তানের টপ-অর্ডার। প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানকে ডাবল-ফিগারে পৌঁছাতেই দেয়নি বাংলাদেশের বোলাররা। ৪২ রানে ৫ উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশের বোলাররা। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে ৪৪ দশমিক ৩ ওভারে ১৬১ রানে গুটিয়ে দিয়ে অবিস্মরনীয় এক জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। বল হাতে বাংলাদেশের হয়ে খালেদ মাহমুদ সুজন ৩টি, সাইফুদ্দিন আহমেদ-মোহাম্মদ রফিক-মিনহাজুল আবেদিন ও নাঈমুর রহমান দুর্জয় ১টি করে উইকেট নিয়েছিলেন।

বিশ্বকাপের অতীত নিয়ে কথা বলা শেষে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার স্মৃতি রোমন্থন করেন ওয়াসিম। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন ওয়াসিম। ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে ওয়াসিমকে দলে ভেড়ায় আবাহনী। এতে ক্রীড়াঙ্গনে হৈচৈ পড়ে যায়। আবাহনীতে খেলার ব্যাপারে ওয়াসিম বলেন, ‘কামাল (আ হ ম মুস্তাফা কামাল, আবাহনীর সাবেক পরিচালক) ভাই আমার পারিবারিক বন্ধু। তিনিই আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আবাহনীর হয়ে খেলার জন্য। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে মোহামেডানের বিপক্ষে খেলতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে কী পরিমাণ উন্মাদনা ঐ ম্যাচে দেখতে পেরেছি। তখনই বুঝতে পারি, বাংলাদেশের ক্রিকেট কতটা জনপ্রিয়। পাকিস্তানেও আমরা ক্লাব পর্যায়ের ক্রিকেট, ফুটবল বা হকিতে এত আবেগ দেখিনি।’

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ব্রাদার্সের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর মোহামেডানের বিপক্ষে খেলতে নামেন ওয়াসিম। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়াম ছিলো কানায়-কানায় পূর্ন। অবশ্য ম্যাচটি হেরেছিলো আবাহনী। ঢাকার সেই দিনগুলোর কথা মনে করে আকরাম বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো আমার খুব কাছের একটা জায়গা। বাংলাদেশের মানুষ খুবই আন্তরিক, অতিথিপরায়ণ। এখানকার খাবার-দাবার অসাধারণ। বিশেষ করে মাছের ঝোলের কথা মনে পড়ে এখনো। আমি বাংলাদেশ ও মাছের ঝোল অনেক মিস করি।’

সে সময় ওয়াসিম আকরাম বাংলাদেশের ঘরোয়া আসরে খেলার কারণে দেশের ক্রিকেট অনেক বেশি প্রাণোচ্ছল-প্রাণোবন্ত হয়েছিল বলে জানান আকরাম-নান্নু-পাইলট।

নান্নু বলেন, ‘ওই সময়ে আমরা ওয়াসিমের মতো একজন বোলারকে ঘরোয়া ক্রিকেটে পেয়েছিলাম, এটা আমাদের জন্য অনেক উপকারে এসেছিলো। ওয়াসিমের মত বোলারদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়েছি এবং অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি।’

ওয়াসিমের প্রশংসা করে আকরাম বলেন, ‘এখন তো অনেক ম্যাচ হয়। কিন্তু আমাদের সময় আসলে এত ম্যাচ হতো না। দুই বছরে আমরা দুই তিনটা ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে পারতাম। শুধু এশিয়া কাপ খেলা হতো। ফলে তখন এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিল যে ওয়াসিমের মতো একজন বড় ক্রিকেটার আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন। আমরা তার মতো বোলারের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেরেছি।’

আকরাম আরো বলেন, ‘আমি একটা কথা বলতে চাই, ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর পাকিস্তান-ভারত-শ্রীলংকা আমাদের ক্রিকেটকে অনেক সহযোগিতা করেছে। তাদের দেশে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই আজকের অবস্থানে আসতে তাদেরও অবদান অনেক বেশি।’

পাইলটও ঐ ম্যাচের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘ওয়াসিম যখন আবাহনীতে খেলতে আসলেন, আমিও তখন আবাহনীতে। প্রথম ম্যাচে আমি ভালো কিপিং করি। দারুণ একটা ক্যাচও নিয়েছিলাম। তখন ওয়াসিম এসে আমাকে বললেন, তুই তো মঈনের (পাকিস্তানের সাবেক উইকেটরক্ষক, মঈন খান) মতো ক্যাচ নিয়েছিস।’

ওয়াসিম-আকরাম-নান্নু-পাইলটদের ২৫ বছর আগে স্মৃতির গল্প শেষে পাকিস্তানের বাঁ-হাতি পেসারকে একটি প্রশ্ন করেন তামিম, ‘পাকিস্তানে প্রচুর ফাস্ট বোলার উঠে আসে, বাংলাদেশেও কীভাবে সম্ভব, যেহেতু কন্ডিশন প্রায় একই।’

ওয়াসিম বলেন, ‘বয়স যদি ১৬ হয় তবে, তাকে ভালোভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে। কারণ সে মাত্র বেড়ে উঠছে এবং তার ইনজুরিতে পড়ার শঙ্কা প্রবল। অবশ্যই তার বোলিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের দুই বা তিনদিনের ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিতে হবে।

এছাড়া একজন বোলার যেন চোটে না পড়ে সেদিকে সবার আগে খেয়াল রাখতে হবে। তাকে টি-২০ নয়, দুই বা তিন দিনের ক্রিকেট খেলাতে হবে প্রচুর। উইকেট থেকে যেন সুবিধা পায় পেসাররা, সেটিও দেখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বেশি-বেশি দুই-তিন দিনের ম্যাচ খেলাতে হবে।’

পুরনো স্মৃতি ও তরুন বোলারদের পরামর্শ দেয়ার মাঝে ওয়াসিমের সাথে মজার ঘটনা তুলে ধরেন বাংলাদেশের আকরাম।
১৯৯৫ সালে শারজায় এশিয়া কাপের চতুর্থ ম্যাচ ছিলো বাংলাদেশ-পাকিস্তানের। ঐ ম্যাচের আগে আকরামকে পাকিস্তানের ওয়াসিম জিজ্ঞেস করেন, ‘টসে জিতলে কি নিবে? আকরাম বলেন, ‘ফিল্ডিং’।

ওয়াসিম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি নিশ্চিত?’

আকরাম বলেছিলেন, ‘এটাই পরিকল্পনা।’ জবাবে ওয়াসিম বলেন, ‘আজ তো খুব গরম। তাহলে আমি আর ওয়ার্ম আপ করছি না।’

এরপর টস’এর আগে আকরামের কাছে এসে নান্নু টস বিষয়ে জানতে চান। আকরাম বলেন, ‘টসে যাওয়ার আগে নান্নু ভাই এসে বললেন, টস জিতলে কেন ফিল্ডিং নিবে? পাকিস্তান আগে ব্যাট করলে তো তিনশ ছাড়িয়ে যাবে। জিতলে ব্যাটিং নেওয়াই ভালো। এরপর আমি টস জিতে ব্যাটিং নেই।’

পরে ওয়াসিম বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে এসে আমাকে (আকরাম) বলেছিলো, ‘আকরাম, মাঠে আসো, তোমাকে আমি দেখে নিবো।’

ওই ম্যাচে আগে ব্যাট করে ৫০ ওভার খেলে ৮ উইকেটে ১৫১ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। আমিনুল ইসলাম বুলবুল ৮১ বলে ৪২ ও অধিনায়ক আকরাম ৮২ বলে ৪৪ রান করেন। জবাবে ১২২ বল বাকী রেখে ৬ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় পাকিস্তান।

সূত্র : বাসস

LEAVE A REPLY