একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি বেগম মুজিবের মেজাজ-মর্জি

আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২২
0


সোহেল সানি

“তোদের আচার-আচরণ ও মেজাজ-মর্জি তো এখন এরকম হবেই, কারণ তোরা তো এখন পে-সিডেন্টের ছেলেমেয়ে।” বঙ্গবন্ধুর জীবন-মরণের সহযাত্রী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব “প্রেসিডেন্ট” শব্দটি ইচ্ছে করেই ব্যঙ্গ করে উচ্চারণ করে শাসাচ্ছিলেব মেয়ে রেহানা ও শিশুপুত্র রাসেলকে। দিনটি ছিল ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। যেদিন বঙ্গবন্ধু “দ্বিতীয় বিপ্লব” ঘোষণা করে সংবিধান চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনপূর্বক প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন।

বেগম মুজিব ইতিপূর্বে কখনও তাঁর ছেলেমেয়েদের কাউকে ক্রুদ্ধ ও রূঢ়ভাবে বকাবকি করতে দেখা যায়নি। পুত্রকন্যাকে উপর্যুক্ত কথাগুলো বলাই শুধু নয়, আদুরে পুত্র শেখ রাসেলের খেলনার জিনিসপত্রে ভর্তি বাক্সটাও ঘরের বাইরে ফেলে দেন বেগম মুজিব।

এসময় অন্যকক্ষে বড় মেয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত) রাফিয়া আখতার ডলির সঙ্গে কথা বলছিলেন। যাহোক বঙ্গবন্ধুর সংসদ কক্ষেই রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণের পর স্পীকার আব্দুল মালেক উকিল সংসদের শীতকালীন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মূলতবি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরস্থ সড়কের বাসভবনে ফিরেন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। বঙ্গবন্ধু হাতমুখ ধুয়ে শয়নকক্ষে প্রবেশ করে টিভি অন করতেই বেগম মুজিব হাজির হন। স্বামী বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে বলেন,”সংবিধানের এতো ব্যাপক পরিবর্তন, বিশেষ করে একদলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করবে সে সম্পর্কে তুমি আমাকে একটুও আভাস দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলে না? আর তোমার তক্ষুনি সংসদ কক্ষেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? দু’চারদিন দেরী করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো? যাহোক, স্পষ্ট বলে রাখছি যে, আমি এ বাড়ী ছেড়ে তোমার সরকারী রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবনে যাচ্ছি না।” কথাগুলো শুনে বঙ্গবন্ধু মিটমিট করে হাসছিলেন। অতঃপর বঙ্গবন্ধু বললেন, “আমি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তোমাকে সবকিছু বলতে পারি না। এ কথাগুলোর সূত্র বঙ্গবন্ধুরই জ্যেষ্ঠ জামাতা ডঃ এম এ ওয়াজেদ।

তাঁর একটি গ্রন্থ থেকে নেয়া। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা নিয়ে যে ঘরে বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তার আরও কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। বঙ্গবন্ধুর জামাতা অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান কান্ডারী শেখ হাসিনার মাঝেও একটা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল সেই সময়। ২৫ জানুয়ারি রাতে ডঃ ওয়াজেদ ও শেখ হাসিনা দম্পতি ছেলেমেয়ে জয়-পুতুলকে নিয়ে ধানমন্ডির ভাড়া করা নিজেদের বাসায় চলে যান। ডঃ ওয়াজেদ শেখ হাসিনাকে বলেন, ” দেশের একজন সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমার তোমাদের সবাইকে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করি যে, তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) দেশে একদলীয় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা কোনমতেই সমীচীন, যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত হয়নি বা হবে না। কাজেই সংবিধান চতুর্থ সংশোধনী সত্ত্বেও উচিত হবে না দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করা। শেখ হাসিনা ২৬ জানুয়ারি সকালবেলায় পিতার সঙ্গে দেখা করে কথাগুলো বলেন।

বঙ্গবন্ধু মেয়ের কথা শুনে বলেন, ওকে (জামাইকে) বলো, দেশের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা শুধু স্বল্পকালের জন্য। শেখ হাসিনা বাসায় ফিরে স্বামীকে বলেন, “তুমি যেন এ ব্যাপারে অযথা উত্তেজিত না হও এবং দুশ্চিন্তা না করো। আব্বার এই কথাগুলো যেন কারোর কাছে জানাজানি না হয়ে যায় সেজন্য তিনি তোমাকে সর্বদা সংযত ও হুশিয়ার থাকতে বলেছেন অন্যের সঙ্গে কথাবার্তায়। বঙ্গবন্ধু ওদিনই বিকেলে মনসুর আলীকে প্রধানমন্ত্রী করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১১ ফেব্রুয়ারী জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রতিবাদ করে সংসদ সদস্য পদে ইস্তফা দেন। কিন্ত অনেকেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসলেও সংসদ সদস্য পদ হারানোর ভয়ে পক্ষেই ভোট দেন। তাদের প্রায় সবাই মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন। কমরেড মনি সিং এর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি – ন্যাপ বাকশালে যোগ দিলে জাতীয় সংসদের ৮ জন বিরোধী সদস্যের ৪ জন প্রবীণ নেতা অধুনালুপ্ত পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, জাসদের আব্দুস সাত্তার, সৈয়দ কামরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও মিস্টার খোয়াই বেয়োজরও বাকশালে যোগদান করেন। যাহোক একদলীয় শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেও যারা বাকশালের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই তাদের স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করছি। তবে ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়ার বরাত দিয়ে শেখ হাসিনা তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, আপনার জামাই বলেছেন, বঙ্গবন্ধু দেশ বিদেশে একজন জাতীয়তাবাদী গনতন্ত্রী ও প্রগতিশীল মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরূপে পরিচিত।

সারা বিশ্বের যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতো সম্মান মর্যাদা দিয়েছেন, যাদের মধ্যে বিভ্রান্তি শুধু নয়,তাঁর ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হয়ে যাবে। দাতা দেশগুলো সরকারকে যে অর্থ প্রযুক্তি সাহায্যদানে ইতস্ততই শুধু করবে না, বরং এদের কেউ কেউ তা একেবারে বন্ধও করে দিতে পারে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ বিকেল পশ্চিম জার্মানির উদ্দেশ্যে ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। অপরদিকে একই বছর ২৯ জুলাই ঢাকা ত্যাগ করেন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা (দুইশিশুসন্তানসহ), শেখ রেহানা। ১৯৭৫ সালে বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের আগে ১৮ জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা শুরু হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম আলোচনার সূত্রপাত করেব এই বলে যে,”বঙ্গবন্ধু”, আপনি সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তগ্রহণ করতে যাচ্ছেন সেটা কি এবং কেন তা নিজ মুখে বলুন। আপনি যা বলবেন তা গৃহীত হবে এবং পরে আইনে পরিণত করা হবে।” বঙ্গবন্ধু তখন বলেন, “আমি সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে আগ্রহী, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাই। যারা আমার বক্তব্য সমর্থন করো, তারা হাত উঠাও।” পলকের মধ্যে সবার হাত উঠে গেলো। সভায় ইতিপূর্বে নৌপরিবহন মন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত জেনারেল এমএজি ওসমানী একদলীয় শাসনপদ্ধতি নিয়ে

বলেন, “আমরা আইউব খানকে দেখেছি, ইয়াহিয়া খানকে দেখেছি, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুজিবুর রহমান খান হিসেবে দেখতে চাই না।” বঙ্গবন্ধু সভা কর্তৃক সর্বময় ক্ষমতা প্রাপ্তির পর পরই বৈঠক শেষ করে সংসদ নেতার কক্ষে চলে যান। সেখানে বঙ্গবন্ধু জেনারেল ওসমানীকে তলব করেন। তিনি ওসমানীর উদ্দেশ্যে বলেন,” Don’t be excited my old friend, people are fed up with fiery speeches, They want some revolutionary changes in the social, political and economic system.” জেনারেল ওসমানী বঙ্গবন্ধুর কথা ভ্রুক্ষেপ না করে একদলীয় শাসন পদ্ধতির বিরুদ্ধে ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ থেকে ইস্তফা দেন। এর আগের দিন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, আব্দুস সামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলীকে কারারুদ্ধ করেন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ। জেনারেল ওসমানী নিশ্চয়ই জেনেশুনে অবৈধ প্রেসিডেন্টের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর এতোটাই আনুগত্য ছিল যে, জাতীয় চার নেতা হত্যার খবরে যখন বঙ্গভবনে মোশতাক ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা খালেদ-শাফায়েত বাহিনীর হাতে নাজেহাল হচ্ছিল, তখন তাদের বাঁচাতে এগিয়ে যান জেনারেল ওসমানী। জাতির পিতার হত্যাকারী বাস্টার্ড গালি দিয়ে যখন অভ্যুত্থানকারীরা প্রেসিডেন্ট মোশতাকের দিকে স্টেনগান তাক করেন তখন জেনারেল ওসমানী তাকে রক্ষা করেন। নিহত জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বাধীন মুজিব নগর সরকারেরই অধীনে এমএজি ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগলাভ করেছিলেন। আওয়ামী লীগকে বড় করুণ পরিণতি হজম করতে হয়েছে।

বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের আগে মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর জামাতা ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে তার আগামসিহ লেনস্থ বাড়িতে দাওয়াত করেন। মোশতাক তখনও বানিজ্যমন্ত্রী। ডঃ ওয়াজেদ বাড়িতে পৌঁছে দেখেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের সঙ্গে আলাপরত। মঈনুল হোসেন চলে যাবার পর মোশতাক ওয়াজেদকে বলেন,” তোমার শশুর যে দেশের সংবিধান পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করেছেন সে সম্মন্ধে তুমি কি কিছু জানো কিংবা শুনেছো কিনা? তোমার শশুরের এটা করা মারাত্মক ভুল হবে। “ওয়াজেদ মিয়া প্রতিত্তোরে বলেন,” কাকা আমি স্বাধীনতার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোন রাজনৈতিক বিষয়ে কথাবার্তা বলি না।

আপনি বরং শেখ মনির সঙ্গে ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করুন।” খন্দকার মোশতাক তখন বলেন, “মনিকে বলে কিছু হবে না, কারণ সে নিজেই তোমার শশুরের পক্ষাবলম্বন করছে।” একদলীয় শাসন পদ্ধতির বিরুদ্ধে সংগোপনে মোশতাকের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে উঠেছিল বাকশাল মন্ত্রিসভার তিন সদস্য (প্রতিমন্ত্রী) তাহের উদ্দিন ঠাকুর, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, কে এম ওবায়দুর রহমান ও চীফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের। মোশতাক প্রেসিডেন্ট হবার পর উপরোক্ত চার নেতা তারও প্রতিমন্ত্রী হন এবং জাতীয় চারনেতাকে বাসা থেকে তারাই বঙ্গভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন। মোশতাকের মুখের ওপর সরকারে যোগদানের প্রস্তাব ছুঁড়ে মাড়ার কারণে চার নেতাকে কারারুদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর খুনীদের হাতেই প্রাণ দিতে হয়। ১৯৬৬-১৯৭২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বপালনকারী বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং মুক্তিযুদ্ধের খলিফা খ্যাত চার ছাত্রনেতার মধ্যে শীর্ষে অবস্থানকারী অনলবর্ষী বক্তা নূরে আলম সিদ্দিকী একদলীয় শাসন পদ্ধতির বিরোধিতা করলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি এতোটাই অনুরক্ত ছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত বাকশাল পদ্ধতির পক্ষেই সংসদে ভোট দিয়েছেন। তবে মিজানুর রহমান চৌধুরীর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, “একদলীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের দিন থেকেই নূরে আলম সিদ্দিকী হাতে তসবিহ গুনতে শুরু করেন।” বলা বাহুল্য মিজান চৌধুরী পরলোকে। কিন্তু নূরে আলম সিদ্দিকী আজও হাতে সারাক্ষণ তসবিহ গুনেন। আওয়ামী লীগ (মিজান) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইউসুফ আলী মন্ত্রীত্বের টোপ গিলে বিএনপিতে এবং পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মূল আওয়ামী লীগে ফিরে গেলে নূরে আলম সিদ্দিকী সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। পরে তিনিও মূল আওয়ামী লীগে ফিরে এলেও বর্তমানে নিস্ক্রিয় রয়েছেন। তাঁর পুত্র তাহজিব সিদ্দিকী অবশ্য আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগ (মিজান) সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ছেড়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদের প্রধানমন্ত্রীত্বের টোপ গিলেন। পরবর্তীতে এরশাদের বিরুদ্ধেও পৃথক জাতীয় পার্টি করেন। শেষ বয়সে আওয়ামী লীগে ফেরার কিছুদিন পর ইন্তেকাল করেন।

ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বড়পুত্র ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। আসাযাওয়া ছিল বঙ্গবন্ধু বাড়িতেও। ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন একদলীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তন অর্থাৎ সংবিধান চতুর্থ সংশোধন বিল পাস হবার একদিন আগে ২৪ জানুয়ারি(১৯৭৫) বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে শেখ কামালকে বলেন, “আগামীকাল তোর আব্বা প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, অতএব তোরা প্রেসিডেন্টের বঙ্গভবনে নাকি ধানমন্ডিস্থ এই বাড়িতেই থাকবি?” শেখ কামাল বলেছিলেন, “না,না না, আমরা কোন অবস্থাতেই বঙ্গভবনে যাবো না।” ওদিন বিকেলে খন্দকার মোশতাকও একদলীয় শাসন পদ্ধতির বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুর সায় না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ মেজাজ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন মোশতাক। গেইটে দেখা হয় বঙ্গবন্ধুর জামাতা ডঃ ওয়াজেদের সঙ্গে। মোশতাক একটু অদূরে ওয়াজেদকে টেনে নিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন,”আগামীকাল তোমার শশুর সংবিধানের যে পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন সেটা শুধু ভুলই হবে না, দেশবিদেশে তাঁর ভাবমূর্তি অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তেতলায় গিয়ে তোমার শশুরকে বিষয়টি অনুধাবন করানোর চেষ্টা করো।

খন্দকার মোশতাক ডঃ ওয়াজেদকে আরও বলেন যে, “আমি আমার শেষ চেষ্টা করে বিফল মনোরথে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ফিরে যাচ্ছি।” ডঃ ওয়াজেদ শশুরের সঙ্গে দেখা করে একথা বলবেন ভাবলেও তা আর হয়ে ওঠে না। ততক্ষণে বঙ্গবন্ধু সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এম মনসুর আলীকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু রাত সাড়ে দশটায় বাড়িতে ফিরে শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত কথাবার্তা শেষ হলে শেখ মনি তার বাসায় চলে যান। পরদিন ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। সংবিধান চতুর্থ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে দেশে কায়েম হয় একদলীয় রাষ্ট্রপতির শাসনব্যবস্থা।

এ আমূল পরিবর্তন বঙ্গবন্ধুর ভাষায় “দ্বিতীয় বিপ্লব।” প্রেসিডেন্টের আদেশে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ – সংক্ষিপ্ত নাম যার বাকশাল। দলে দলে সরকারি বেসরকারি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীরা আবেদন করে সদস্য প্রাপ্তির জন্য। দ্রুত সুফলও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাতে কি! দেশবিদেশের ষড়যন্ত্র থেমে থাকে? মোটেই নয় বরং ষড়যন্ত্র চক্রান্ত আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সেই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত যে সত্যাসত্য তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় গোটা জাতির। খন্দকার মোশতাক আহমেদ একদলীয় শাসনপদ্ধতির বিরোধিতা করেও বাকশালের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। ছিলেন বানিজ্যমন্ত্রী। সেই মোশতাকই কিনা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্টের মসনদে উপবিষ্ট হলেন।

খুনী ফারুক-রশিদদের “সূর্য সন্তান” হিসাবে অভিহিত করে বললেন,” অন্য কোন উপায়ে স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে উৎখাত করা সম্ভব ছিল না, বিধায় সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের সামনে স্বর্ণ দ্বার খুলে দিয়েছে। অথচ ২০/২৫ জন জুনিয়র সামরিক কর্মকর্তাসহ গোলন্দাজ ও ট্যাংকবাহিনীর ১৪০০ সৈন্য এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। মোশতাকের চারপাশে জড়ো হলো কয়েকঘন্টা আগেও যারা বঙ্গবন্ধুর মোসাহেবি করেন সেইসব মন্ত্রীরা। বঙ্গবন্ধুর দুই রাষ্ট্রপতির একজন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আট আগস্ট দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর বাকশাল মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সেই তিনি খন্দকার মোশতাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন। আরেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহ কিনা মোশতাকের উপরাষ্ট্রপতি হলেন। দুই শিক্ষাবিদ ডঃ আজিজুর রহমান মল্লিক ও ডঃ মোজাফফর আহমদ চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু যথাক্রমে শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রী করেছিলেন, অথচ সেই দুই ব্যক্তিই মোশতাকের মন্ত্রী হয়ে বসলেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী, আব্দুল মান্নান, আব্দুল মোমিন, মনোরঞ্জন ধর, আসাদুজ্জামান খান, ফণিভূষণ মজুমদার, সোহরাব হোসেন, প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী, অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরী, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়দুর রহমান, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মোমিন উদ্দিন আহমেদ, ডাঃ ক্ষীতিশ চন্দ্র মন্ডল, রিয়াজুদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া, মোসলেম উদ্দিন খান ও সৈয়দ আলতাফ হোসেন মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন। শুধুমাত্র ফণিভূষণ মজুমদারকে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে মন্ত্রীপদে শপথ পড়ানোর কথা শোনা গেলেও অন্যান্যের মন্ত্রীগ্রহণে কোন জোরজবরি ছিল বলে ইতিহাসের সূত্র সাক্ষ্য দেয় না। বরং কে কোন দফতর পাবেন সে নিয়েও খুনীদের দিয়ে তদবির করেন বলে জানা যায়। উপরোক্তদের মধ্যে কেবল মোসলেম উদ্দিন হাবু মিয়া বঙ্গবন্ধুর বাকশাল সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না। ২৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় মন্ত্রিসভার সর্বসম্মতিক্রমে।

মন্ত্রিসভায় চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত ছিলো “জাতীয় টুপি” আইন ঘোষণা। খন্দকার মোশতাক গাঢ় ছাই রঙের কিস্তি টুপিটাই হয়ে গেলো জাতীয় টুপি। তবে তাসের ঘরের মতো মাত্র ৮১ দিনের মাথায় অবৈধ ক্ষমতা মোশতাক সরকারের মাথার ওপর ভেঙে পড়লো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরী শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে মোকাবিলা করতে হয়েছে দেশবিদেশের ষড়যন্ত্র শুধু নয়, নিজ দলের নেতাদেরও নানা চক্রান্তকে। বড় ট্রাজেডি যে, দল পরিচালনা করতে গিয়ে মোশতাক মন্ত্রিসভারও বহু সদস্যকে অনিবার্য কারণে মেনে নিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যে সুবিচারের প্রশ্ন, হয়তো সেটি উঠতো না, তখন (১৯৯৬) যদি মোশতাক মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাতারে উপবিষ্ট না থাকতেন।

লেখকঃ সম্পাদক ,দেশ জনতা ডটকম