খেতাব পেয়েছি কিন্তু যুদ্ধাহত ভাতা জোটেনি গত ৪৯ বছরেও — বীর প্রতিক মতিউর রহমান

আপডেট: ডিসেম্বর ২৩, ২০২০
0

শাহজাহান আলী মনন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি :
স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী দ্বার প্রান্তে । স্বাধীনতার যুদ্ধে গুরুত্বরভাবে আহত মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান (বীর প্রতিক) যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আজও পায়নি। তাঁর শরীর আর মুখমন্ডলে যুদ্ধকালীন পাক সেনাদের গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার চিহ্ন নিয়ে যুদ্ধাহত ভাতার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এখনও।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দসহ উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারও কাছ থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা না পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হৃদয় নিয়ে শেষ অবধি দারস্থ হয়েছে সংবাদকর্মীদের। যাতে তার ভাতা বঞ্চনা ও হয়রানীর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর হয়।

কান্নাভেজা কন্ঠে তিনি জানান যে, ১৯৭১ সালে ৬ নং সেক্টরের সাব সেক্টর-৬ এর অধীনে ৩ বি বি কোম্পানীর অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। পঞ্চগড় মহাকুমার পূর্বদিকে বড়শশী কাজল দীঘি ইউনিয়ন এলাকায় যুদ্ধ করেন তিনি। ’

৭১ এর জুন থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৮ টি যুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করে সফল হন। এর মধ্যে ২৯ নভেম্বর পঞ্চগড় মহকুমাকে স্বাধীন ঘোষণা করেন সাব সেক্টর কমান্ডার স্ক্রোয়াডন লিডার সদর উদ্দিন। এদিন বিকাল ৪ টায় পূর্বের এসডিও অফিস বর্তমান ডিসি অফিস প্রাঙ্গনে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

এ প্রতিবেদকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি বর্ণনাকালে বলেন, যুদ্ধকালীন তাবুতে বিশ্রামের সময় বিশাল আকৃতির গোখরো সাপ তার শরীরের উপর দিয়ে চলে যায়। শুধু পানি খেয়ে অনেক দিন পার করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, বড়শশী কাজল দীঘি ইউনিয়ন এলাকায় পাকবাহিনীর আস্তানায় গ্রেনেড নিক্ষেপের সময় পাল্টা পাক বাহিনীর আর্টিলারী সেল এর স্পিলিন্ডারের আঘাতে মুখমন্ডল ক্ষত বিক্ষত হয়। আহতাবস্থায় জলপাইগুড়ি হাসপাতালে ১৩ দিন চিকিৎসা নিয়ে আবারো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পঞ্চগড়ের পূর্বদিকের তালমা এলাকায় ব্রীজ গুড়িয়ে দেওয়ার সময় পাক বাহিনীর রাইফেলের গুলি তাঁর পিঠের বামপাশ ঝাঁঝড়া করে দেয়।

যুদ্ধাহতাবস্থায় ৩ জন পাক সেনাকে আটক করে ক্যাম্পে আনেন এবং ইন্ডিয়ান আর্মির সহায়তায় জলপাইগুড়ি জেলখানায় পাঠানো হয়।
আলীদুয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার পরে আবারও ফিরে যান রণাঙ্গনে। পঞ্চগড় ওকড়াবাড়ী বাজার এলাকায় পাকবাহিনীর দুইজন সদস্য ও ৬ জন রাজাকার একজন বাঙ্গালী যুবতীকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ১ নং প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাসহ তাদের আটক করা হয়। রাজাকাররা পালিয়ে গেলেও ওই দুইজন পাকসেনাদের ইন্ডিয়ান আর্মির হাতে সোপর্দ করা হয়। ওই সময় পাকবাহিনীর গুলিতে ডান পায়ের উরুতে গুলি লাগে। গুরুত্বর আহতাবস্থায় শিলিগুড়ি সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আবারও ঝাপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।
২৬ নভেম্বর ভোর ৫টার দিকে ১৫শ’ রাজাকারসহ পাকবাহিনীর ১৩ জন সদস্য সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে আমতলী কাজীপাড়া নামক স্থানে পাকবাহিনীর সাথে প্রায় তিন ঘন্টা তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৩ জন পাকবাহিনীকে হত্যা করা হয়। এ যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে।
বীর প্রতিক মতিউর রহমান আক্ষেপের সাথে বলেন, যুদ্ধে এত অবদান রাখার কারণই আমাকে বীর প্রতিক উপাধিতে ভুষিত করা হয়। ভারতীয় তালিকায় আমার মুক্তিযোদ্ধা নং ৪১২০২, লালবই ও মুক্তিবার্তা গেজেট নং ১৯৪। এরপরও যুদ্ধাহত ভাতা প্রাপ্তিতে ভোগান্তিতে পড়েছি। ১৯৯৫ সালে এবং বিগত ২০০৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাহত ভাতার জন্য আবেদন করেছি।

পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২৫ জুলাই পূনঃরায় আবেদন করি। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে যুদ্ধাহত ভাতা পাওয়ার জন্য বার বার আবেদন করেও কোন লাভ হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বরাবরেও গত ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর আবেদন করেও এখনও পর্যন্ত কোন সুফল পাইনি।

তিনি আবেগ তাড়িত হয়ে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে হাজারও বাঙ্গালী নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিল দেশের জন্য। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত অগণিত বাঙ্গালী নারীদের সম্ভ্রম ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পঙ্গুত্ব বরণ করেও হাসিমুখে দিন কাটাচ্ছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের যুদ্ধাহত ভাতা পেলে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে কষ্ট তা ভুলে বাকী জীবনটা সুখে অতিবাহিত করতে পারতো। তাই বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়া প্রায় ৮০ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা (বীর প্রতিক) মোঃ মতিউর রহমান এর আকুতি তার প্রাপ্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা প্রদানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
সৈয়দপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের কমান্ডার একরামুল হক বলেন, যথা নিয়মে বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান (বীর প্রতিক) যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। অন্যরা পেলেও তিনি যে কি কারণে এখনও পাননি তা আমার জানা নেই। তবে তার ভাতাটা দ্রুত দেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। (ছবি আছে)

শাহজাহান আলী মনন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি